কবি, সাহিত্যিক, সম্পাদক এবং সাংবাদিক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (জন্মঃ- ৬ মার্চ, ১৮১২ - মৃত্যুঃ- ২৩ জানুয়ারি, ১৮৫৯) কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত, ব্যপ্ত চরাচর, / যাহার প্রভায় প্রভা পায় প্রভাকর। বাংলাসাহিত্যে আধুনিক যুগের সূত্রপাত হয় উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে। এই যুগের প্রথম কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। যিনি "গুপ্ত কবি" নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর ছদ্মনাম 'ভ্রমণকারী বন্ধু'। এছাড়া বহুবিধ পত্র-পত্রিকা সম্পাদনা করে কবি-সাহিত্যিকদের উৎসাহ প্রদানের জন্য সমসাময়িককালে তিনি "কবিগুরু" হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছ্নে। সামাজিক ও ব্যঙ্গকবিতাগুলোর জন্য তাঁর সর্বাধিক খ্যাতি। রঙ্গরসপ্রবণতা ও লঘু চপলভঙ্গি তাঁর কবিতাগুলোকে উৎকর্ষ দান করেছে। তাঁর কবিতায় স্বদেশ, স্বভাষা ও ধর্মের প্রতি গভীর ভালবাসা ফুটে ওঠে | কবি ঈশ্বরচন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার কাঞ্চনপল্লী (বা কাঞ্চনপাড়া) গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা হরিনারায়ণ দাশগুপ্ত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ছিলেন। মায়ের নাম শ্রীমতি দেবী। তাঁর বয়স যখন দশ তখন তাঁর মা পরলোকগমন করেন। এর পর ঈশ্বরচন্দ্র ইংরাজি বিদ্যাভ্যাস এবং জীবিকান্বেষণের জন্য কলিকাতায় মামার বাড়ীতে বাস করতে শুরু করেন। মাত্র ১৫ বৎসর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় গৌরহরি মল্লিকের কন্যা রেবার সঙ্গে। ঈশ্বর গুপ্তের সারাজীবন মোটেই সুখের হয়নি। ‘ঈশ্বরগুপ্ত, সাংবাদিক কবি ও গদ্যশিল্পী’তে ড. রেণুপদ ঘোষ লিখেছেন, “তাঁর সেই ব্যর্থ দাম্পত্যজীবনের দুঃখ বা গ্লানির মত অসুস্থতা থেকে ‘সংবাদ প্রভাকর’-ই ঈশ্বর গুপ্তকে মুক্তির নাসিংহোমের নির্ভুল ঠিকানা দিতে পেরেছিল। রচনায় বৈচিত্র থাকলেও ঈশ্বর গুপ্ত কবি হিসেবেই পরিচিত। তার কবিতার সংখ্যা যেমন অগণিত, তেমনি বিষয়ের বৈচিত্রও কম নয়। বঙ্কিমচন্দ্র ঈশ্বর গুপ্তের কবিতাগুলোকে বিষয়ানুযায়ী কয়টি ভাগে বিভক্ত করেছিলেনঃ ১। পারমার্থিক ও নৈতিক বিষয়ক কবিতা, ২। সামাজিক ও ব্যঙ্গপ্রধান কবিতা, ৩। রসাত্মক কবিতা, ৪। যুদ্ধ বিষয়ক কবিতা, ৫। ঋতুবর্ণনা প্রধান কবিতা, ৬। বিবিধ বিষয়ক কবিতা, ৭। শকুন্তলার কাহিনী নিয়ে রচিত কবিতা, ৮। সারদা-মঙ্গল বা উমা-মেনকার প্রসঙ্গে কবিতা, ৯। কাব্যকানন, ১০। রসলহরী ও ১১। কবিতাগুচ্ছ। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সাহিত্যসাধনার সূত্রপাত হয় ১৮৩১ সাল থেকে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রধান লেখক। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি তিনি সংবাদ রত্নাবলী পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। সংবাদ প্রভাকর ছিল একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা, তিনি এটিকে দৈনিকে রূপান্তর করেন ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে। ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে সাপ্তাহিক পাষণ্ড পত্রিকার সঙ্গে সম্পাদক হিসাবে সংযুক্ত। পরবতী বৎসর তিনি সংবাদ সাধুরঞ্জন পত্রিকার দায়িত্বভার পালন করেন। ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর সকল উদ্যমের সঙ্গে আমৃত্যু এই সাংবাদিকতাকে আশ্রয় করে ছিলেন। তাঁর কবি স্বভাবটিও অনেকখানি এই সাংবাদিকতা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। সাংবাদিক জীবনের প্রতিক্ষেত্রে যেখানেই তিনি অবিচার, অবিবেচনা কিংবা অন্যায় পক্ষপাত লক্ষ্য করেছিলেন সেখানেই তাঁর বলিষ্ঠ প্রতিবাদ প্রভাকরের সম্পাদকীয় কলমে সোচচার করে তুলেছিল। উচচশিক্ষিতরা ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি মোহগ্রস্থ হলে ঈশ্বর গুপ্ত তার প্রতিবাদে মুখর হন। সংবাদ প্রভাকরের সম্পাদকীয়তে (১২ বৈশাখ, ১২৫৬ বঙ্গাব্দ) তিনি লেখেন –“দেশীয় লোকেরা পরদেশীয় ভাষাশিক্ষার জন্য অধিক মনোযোগি হওয়াতেই কর্তা সাহেবরা এতদ্দেশ মধ্যে ইংরাজি বিদ্যা বিস্তার নিমিত্ত অধিক যত্ন করিতেছেন। অতএব যুক্তিমতে বিবেচনা করিলে দেশীয় মহাশয়দিগের প্রতিই সকল দোষ অর্পিত হইতে পারে।” যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে ইংরাজের অনুকরণে দেশীয় ঐতিহ্যকে ঘৃণার চোখে দেখা তিনি স্বদেশের অবমাননা গণ্য করছেন, যার অর্থ তাঁর কাছে, শিকড় থেকে নিজেকে উৎপাটিত করা। তিনি যুব সম্প্রদায়ের মোহমুক্তি চেয়ে সম্পাদকীয় কলমে বারে বারে প্রতিবাদ করেছেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অত্যাচার এবং পক্ষপাতমূলক বিচারের লক্ষ্যে ইংরেজদের শাস্তির আওতায় না রাখা ঈশ্বর গুপ্ত সুনজরে দেখেননি। এমন পক্ষপাতদুষ্ট শাসনব্যবস্থাকে তিনি তীব্র কষাঘাত করেছেন। একজন যথার্থ সাংবাদিক যেভাবে রাষ্ট্রকাঠামোর সর্বস্তরে বিচরণ করে সরকারের ত্রুটি বিচু্যতির দিকে সাধারণ মানুষের নজর টানার চেষ্টা করেছ়েন, যাতে সেই অসংগতি সংশোধিত হতে পারে, ঈশ্বর গুপ্ত নির্ভীকভাবে সেটাই করেছেন। যাবতীয় ত্রুটিগুলি তিনি দেখাবার চেষ্টা করেছেন, যাতে মানুষ অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হন। এখানেই নির্ভীক সাংবাদিক-সম্পাদক ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্তের আপসহীন কলমের সার্থকতা। সামাজিক ও ব্যঙ্গকবিতাগুলোর জন্যও ঈশ্বরগুপ্তের সর্বাধিক খ্যাতি। তার রঙ্গরসপ্রবণতা ও লঘু চপলভঙ্গি কবিতাগুলোকে উৎকর্ষ দান করেছে। সে আমলে ইংরেজি শিক্ষাসভ্যতার সংস্পর্শে বাঙালির সমাজ ও জীবনে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল ঈশ্বরগুপ্ত তাকে কবিতার উপজীব্য করেছেন। যেখানেই সামাজিক অনাচার, চারিত্রিক দৈন্য ও আদর্শহীনতা দেখেছেন সেখানেই তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন। ইংরেজদের আচার আচরণকে এ দেশের জন্য অকল্যাণকর মনে করে ইংরেজিয়ানা প্রীতির ব্যঙ্গ করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তার ‘ইংরেজি নববর্ষ’ কবিতায়ঃ গোরার দঙ্গলে গিয়া কথা কহ হেসে। ঠেস মেরে বস গিয়া বিবিদের ঘেঁসে॥ রাঙ্গামুখ দেখে বাবা টেনে লও হ্যাম। ডোন্ট ক্যার হিন্দুয়ানী ড্যাম ড্যাম ড্যাম॥ পিঁড়ি পেতে ঝুরো লুসে মিছে ধরি নেম। মিসে নাহি মিস খায় কিসে হবে ফেম? শাড়িপরা এলোচুল আমাদের মেম। বেলাক নেটিভ লেডি শেম্ শেম্ শেম্ ॥ (সংক্ষেপিত) তিনি গ্রাম গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন এবং কবিগান বাঁধতেন। প্রায় বারো বৎসর গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে তিনি প্রাচীন কবিদের তথ্য সংগ্রহ করে জীবনী রচনা করেছেন। ঈশ্বর গুপ্ত অজস্র কবিতা রচনা করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথম ঈশ্বর গুপ্তের ‘কবিতা সংগ্রহ’ দীর্ঘ ভূমিকাসহ প্রকাশ করেন। তবে অশ্লীলতার কারণে সব কবিতা তিনি সংগ্রহ করেন নি। তার অন্যান্য রচনা হচ্ছেঃ ১।কালীকীর্তন, ২। রামপ্রসাদ সেন লিখিত, ঈশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত; কবিবর ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের জীবনবৃত্তান্ত; ৩। প্রবোধ প্রভাকর; ৪। নিজস্ব কবিতার সঙ্কলনঃ হিত-প্রভাকর, ৫। হিতোপদেশের গল্প গদ্যপদ্যে রচিত, মহাকবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মহাশয়ের বিরচিত কবিতাবলীর সারসংগ্রহ, ৬। কবিভ্রাতা রামচন্দ্র গুপ্ত কর্তৃক সংবাদ প্রভাকর থেকে সংগৃহীত কবিতার খন্ড খন্ড সঙ্কলন, বোধেন্দুবিকাশ, ৭। নাটক; সত্যনারায়ণের ব্রতকথা। পত্রিকা সম্পাদনাঃ ১। সংবাদ প্রভাকর, ২। সংবাদ-রত্নাবলী ৩। পাষন্ড পীড়ন ও ৪।সংবাদ সাধুরঞ্জন। ১৮৫৯ সালের ২৩ জানুয়ারি মৃত্যুবরন করেন কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। যমক (একই বর্ণসমষ্টি একাধিকবার একাধিক অর্থে প্রয়োগ করা) ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের একটি প্রিয় কাব্যকৌশল। কতগুলো নমুনাঃ ১। অতনু শাসনে তনু তনু অনুদিন (১ম তনু= দেহ, ২য় তনু= কৃশ) ২। ভাবে নাহি ভাবি ভাবি (১ম ভাবি= ভাবনা করি, ২য় ভাবি= ভবিষ্যৎ) ৩। আনা দরে আনা যায় কত আনারস (১ম আনা= টাকার ১/১৬ অংশ, ২য় আনা= আনয়ন করা) ৪। প্রকাশিয়া প্রভাকর শুভ দিন দিন (১ম দিন= দিবস, ২য় দিন= প্রদান করুন) ৫। মিথ্যার কাননে কভু ভ্রমে নাহি ভ্রমে (১ম ভ্রমে= ভুলে, ২য় ভ্রমে= ভ্রমণ করে) ৬। দুহিতা আনিয়া যদি না দেহ, নিশ্চয় আমি ত্যাজিব দেহ (১ম দেহ= প্রদান কর, ২য় দেহ= শরীর) ৭। ওরে ভণ্ড হাতে দণ্ড এ কেমন রোগ। দণ্ডে দণ্ডে নিজ দণ্ডে দণ্ড কর ভোগ।। (অর্থঃ দণ্ডে দণ্ডে= সময়ে সময়ে, নিজ দণ্ডে= নিজের ডাণ্ডায়, দণ্ড= শাস্তি) ৮। কয় মাস খাও মাস উদর ভরিয়া। (অর্থঃ ১ম মাস= ৩০ দিন, ২য় মাস= মাংস) ৯। চিত্রকরে চিত্র করে করে তুলি তুলি। (অর্থঃ চিত্রকরে = চিত্রকর+ ৭মী বিভক্তি। চিত্র করে = ছবি আঁকে। করে= হাতে। ১ম তুলি = উত্তোলন করে, ২য় তুলি= আঁকার কাঠি) ১০। সেতার অনেক আছে, সে তার ত নাই। (অর্থঃ সেতার= বাদ্যযন্ত্রবিশেষ, সে তার= সেই তন্ত্র) ১১। তানপুরা আছে মাত্র, তান পুরা নাই। (অর্থঃ তানপুরা= বাদ্যযন্ত্রবিশেষ, তান পুরা= সম্পূর্ণ তান) মাতৃভাষা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মায়ের কোলেতে শুয়ে ঊরুতে মস্তক থুয়ে খল খল সহাস্য বদন। অধরে অমৃত ক্ষরে আধ আধ মৃদু স্বরে আধ আধ বচনরচন।। কহিতে অন্তরে আশা মুখে নাহি কটু ভাষা ব্যাকুল হয়েছে কত তায়। মা-ম্মা-মা-মা-বা-ব্বা-বা-বা আবো আবো আবা আবা সমুদয় দেববাণী প্রায়।। ক্রমেতে ফুটিল মুখ উঠিল মনের সুখ একে একে দেখিলে সকল। মেসো, পিসে, খুড়ো, বাপ জুজু, ভুত, ছুঁচো, সাপ স্থল জল আকাশ অনল।। ভাল মন্দ জানিতে না, মল মুত্র মানিতে না, উপদেশ শিক্ষা হল যত। পঞ্চমেতে হাতে খড়ি, খাইয়া গুরুর ছড়ি, পাঠশালে পড়িয়াছ কত।। যৌবনের আগমনে, জ্ঞানের প্রতিভা সনে, বস্তুবোধ হইল তোমার। পুস্তক করিয়া পাঠ, দেখিয়া ভবের নাট, হিতাহিত করিছ বিচার।। যে ভাষায় হয়ে প্রীত পরমেশ-গুণ-গীত বৃদ্ধকালে গান কর মুখে। মাতৃসম মাতৃভাষা পুরালে তোমার আশা তুমি তার সেবা কর সুখে।। তপসে মাছ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ কষিত-কনককান্তি কমনীয় কায়। গালভরা গোঁফ-দাড়ি তপস্বীর প্রায়॥ মানুষের দৃশ্য নও বাস কর নীরে। মোহন মণির প্রভা ননীর শরীরে॥ পাখি নও কিন্তু ধর মনোহর পাখা। সমধুর মিষ্ট রস সব-অঙ্গে মাখা॥ একবার রসনায় যে পেয়েছে তার। আর কিছু মুখে নাহি ভাল লাগে তার॥ দৃশ্য মাত্র সর্বগাত্র প্রফুল্লিত হয়। সৌরভে আমোদ করে ত্রিভুবনময়॥ প্রাণে নাহি দেরি সয় কাঁটা আঁশ বাছা। ইচ্ছা করে একেবারে গালে দিই কাঁচা॥ অপরূপ হেরে রূপ পুত্রশোক হরে। মুখে দেওয়া দূরে থাক গন্ধে পেট ভরে॥ কুড়ি দরে কিনে লই দেখে তাজা তাজা। টপাটপ খেয়ে ফেলি ছাঁকাতেলে ভাজা॥ না করে উদর যেই তোমায় গ্রহণ। বৃথায় জীবন তার বৃথায় জীবন॥ নগরের লোক সব এই কয় মাস। তোমার কৃপায় করে মহা সুখে বাস॥ কে? ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বল দেখি এ জগতে ধার্মিক কে হয়, সর্ব জীবে দয়া যার, ধার্মিক সে হয়। বল দেখি এ জগতে সুখী বলি কারে, সতত আরোগী যেই, সুখী বলি তারে। বল দেখি এ জগতে বিজ্ঞ বলি কারে, হিতাহিত বোধ যার, বিজ্ঞ বলি তারে। বল দেখি এ জগতে ধীর বলি কারে, বিপদে যে স্থির থাকে, ধীর বলি তারে। বল দেখি এ জগতে মূর্খ বলি কারে, নিজ কার্য নষ্ট করে, মূর্খ বলি তারে। বল দেখি এ জগতে সাধু বলি কারে, পরের যে ভাল করে, সাধু বলি তারে। বল দেখি এ জগতে জ্ঞানী বলি কারে, নিজ বোধ আছে যার জ্ঞানী বলি তারে। মানুষ কে? ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কবি, সাহিত্যিক, সম্পাদক এবং সাংবাদিক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (জন্মঃ- ৬ মার্চ, ১৮১২ - মৃত্যুঃ- ২৩ জানুয়ারি, ১৮৫৯) কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত, ব্যপ্ত চরাচর, / যাহার প্রভায় প্রভা পায় প্রভাকর। বাংলাসাহিত্যে আধুনিক যুগের সূত্রপাত হয় উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে। এই যুগের প্রথম কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। যিনি "গুপ্ত কবি" নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর ছদ্মনাম 'ভ্রমণকারী বন্ধু'। এছাড়া বহুবিধ পত্র-পত্রিকা সম্পাদনা করে কবি-সাহিত্যিকদের উৎসাহ প্রদানের জন্য সমসাময়িককালে তিনি "কবিগুরু" হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছ্নে। সামাজিক ও ব্যঙ্গকবিতাগুলোর জন্য তাঁর সর্বাধিক খ্যাতি। রঙ্গরসপ্রবণতা ও লঘু চপলভঙ্গি তাঁর কবিতাগুলোকে উৎকর্ষ দান করেছে। তাঁর কবিতায় স্বদেশ, স্বভাষা ও ধর্মের প্রতি গভীর ভালবাসা ফুটে ওঠে | কবি ঈশ্বরচন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার কাঞ্চনপল্লী (বা কাঞ্চনপাড়া) গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা হরিনারায়ণ দাশগুপ্ত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ছিলেন। মায়ের নাম শ্রীমতি দেবী। তাঁর বয়স যখন দশ তখন তাঁর মা পরলোকগমন করেন। এর পর ঈশ্বরচন্দ্র ইংরাজি বিদ্যাভ্যাস এবং জীবিকান্বেষণের জন্য কলিকাতায় মামার বাড়ীতে বাস করতে শুরু করেন। মাত্র ১৫ বৎসর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় গৌরহরি মল্লিকের কন্যা রেবার সঙ্গে। ঈশ্বর গুপ্তের সারাজীবন মোটেই সুখের হয়নি। ‘ঈশ্বরগুপ্ত, সাংবাদিক কবি ও গদ্যশিল্পী’তে ড. রেণুপদ ঘোষ লিখেছেন, “তাঁর সেই ব্যর্থ দাম্পত্যজীবনের দুঃখ বা গ্লানির মত অসুস্থতা থেকে ‘সংবাদ প্রভাকর’-ই ঈশ্বর গুপ্তকে মুক্তির নাসিংহোমের নির্ভুল ঠিকানা দিতে পেরেছিল। রচনায় বৈচিত্র থাকলেও ঈশ্বর গুপ্ত কবি হিসেবেই পরিচিত। তার কবিতার সংখ্যা যেমন অগণিত, তেমনি বিষয়ের বৈচিত্রও কম নয়। বঙ্কিমচন্দ্র ঈশ্বর গুপ্তের কবিতাগুলোকে বিষয়ানুযায়ী কয়টি ভাগে বিভক্ত করেছিলেনঃ ১। পারমার্থিক ও নৈতিক বিষয়ক কবিতা, ২। সামাজিক ও ব্যঙ্গপ্রধান কবিতা, ৩। রসাত্মক কবিতা, ৪। যুদ্ধ বিষয়ক কবিতা, ৫। ঋতুবর্ণনা প্রধান কবিতা, ৬। বিবিধ বিষয়ক কবিতা, ৭। শকুন্তলার কাহিনী নিয়ে রচিত কবিতা, ৮। সারদা-মঙ্গল বা উমা-মেনকার প্রসঙ্গে কবিতা, ৯। কাব্যকানন, ১০। রসলহরী ও ১১। কবিতাগুচ্ছ। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সাহিত্যসাধনার সূত্রপাত হয় ১৮৩১ সাল থেকে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রধান লেখক। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি তিনি সংবাদ রত্নাবলী পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। সংবাদ প্রভাকর ছিল একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা, তিনি এটিকে দৈনিকে রূপান্তর করেন ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে। ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে সাপ্তাহিক পাষণ্ড পত্রিকার সঙ্গে সম্পাদক হিসাবে সংযুক্ত। পরবতী বৎসর তিনি সংবাদ সাধুরঞ্জন পত্রিকার দায়িত্বভার পালন করেন। ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর সকল উদ্যমের সঙ্গে আমৃত্যু এই সাংবাদিকতাকে আশ্রয় করে ছিলেন। তাঁর কবি স্বভাবটিও অনেকখানি এই সাংবাদিকতা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। সাংবাদিক জীবনের প্রতিক্ষেত্রে যেখানেই তিনি অবিচার, অবিবেচনা কিংবা অন্যায় পক্ষপাত লক্ষ্য করেছিলেন সেখানেই তাঁর বলিষ্ঠ প্রতিবাদ প্রভাকরের সম্পাদকীয় কলমে সোচচার করে তুলেছিল। উচচশিক্ষিতরা ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি মোহগ্রস্থ হলে ঈশ্বর গুপ্ত তার প্রতিবাদে মুখর হন। সংবাদ প্রভাকরের সম্পাদকীয়তে (১২ বৈশাখ, ১২৫৬ বঙ্গাব্দ) তিনি লেখেন –“দেশীয় লোকেরা পরদেশীয় ভাষাশিক্ষার জন্য অধিক মনোযোগি হওয়াতেই কর্তা সাহেবরা এতদ্দেশ মধ্যে ইংরাজি বিদ্যা বিস্তার নিমিত্ত অধিক যত্ন করিতেছেন। অতএব যুক্তিমতে বিবেচনা করিলে দেশীয় মহাশয়দিগের প্রতিই সকল দোষ অর্পিত হইতে পারে।” যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে ইংরাজের অনুকরণে দেশীয় ঐতিহ্যকে ঘৃণার চোখে দেখা তিনি স্বদেশের অবমাননা গণ্য করছেন, যার অর্থ তাঁর কাছে, শিকড় থেকে নিজেকে উৎপাটিত করা। তিনি যুব সম্প্রদায়ের মোহমুক্তি চেয়ে সম্পাদকীয় কলমে বারে বারে প্রতিবাদ করেছেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অত্যাচার এবং পক্ষপাতমূলক বিচারের লক্ষ্যে ইংরেজদের শাস্তির আওতায় না রাখা ঈশ্বর গুপ্ত সুনজরে দেখেননি। এমন পক্ষপাতদুষ্ট শাসনব্যবস্থাকে তিনি তীব্র কষাঘাত করেছেন। একজন যথার্থ সাংবাদিক যেভাবে রাষ্ট্রকাঠামোর সর্বস্তরে বিচরণ করে সরকারের ত্রুটি বিচু্যতির দিকে সাধারণ মানুষের নজর টানার চেষ্টা করেছ়েন, যাতে সেই অসংগতি সংশোধিত হতে পারে, ঈশ্বর গুপ্ত নির্ভীকভাবে সেটাই করেছেন। যাবতীয় ত্রুটিগুলি তিনি দেখাবার চেষ্টা করেছেন, যাতে মানুষ অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হন। এখানেই নির্ভীক সাংবাদিক-সম্পাদক ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্তের আপসহীন কলমের সার্থকতা। সামাজিক ও ব্যঙ্গকবিতাগুলোর জন্যও ঈশ্বরগুপ্তের সর্বাধিক খ্যাতি। তার রঙ্গরসপ্রবণতা ও লঘু চপলভঙ্গি কবিতাগুলোকে উৎকর্ষ দান করেছে। সে আমলে ইংরেজি শিক্ষাসভ্যতার সংস্পর্শে বাঙালির সমাজ ও জীবনে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল ঈশ্বরগুপ্ত তাকে কবিতার উপজীব্য করেছেন। যেখানেই সামাজিক অনাচার, চারিত্রিক দৈন্য ও আদর্শহীনতা দেখেছেন সেখানেই তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন। ইংরেজদের আচার আচরণকে এ দেশের জন্য অকল্যাণকর মনে করে ইংরেজিয়ানা প্রীতির ব্যঙ্গ করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তার ‘ইংরেজি নববর্ষ’ কবিতায়ঃ গোরার দঙ্গলে গিয়া কথা কহ হেসে। ঠেস মেরে বস গিয়া বিবিদের ঘেঁসে॥ রাঙ্গামুখ দেখে বাবা টেনে লও হ্যাম। ডোন্ট ক্যার হিন্দুয়ানী ড্যাম ড্যাম ড্যাম॥ পিঁড়ি পেতে ঝুরো লুসে মিছে ধরি নেম। মিসে নাহি মিস খায় কিসে হবে ফেম? শাড়িপরা এলোচুল আমাদের মেম। বেলাক নেটিভ লেডি শেম্ শেম্ শেম্ ॥ (সংক্ষেপিত) তিনি গ্রাম গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন এবং কবিগান বাঁধতেন। প্রায় বারো বৎসর গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে তিনি প্রাচীন কবিদের তথ্য সংগ্রহ করে জীবনী রচনা করেছেন। ঈশ্বর গুপ্ত অজস্র কবিতা রচনা করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথম ঈশ্বর গুপ্তের ‘কবিতা সংগ্রহ’ দীর্ঘ ভূমিকাসহ প্রকাশ করেন। তবে অশ্লীলতার কারণে সব কবিতা তিনি সংগ্রহ করেন নি। তার অন্যান্য রচনা হচ্ছেঃ ১।কালীকীর্তন, ২। রামপ্রসাদ সেন লিখিত, ঈশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত; কবিবর ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের জীবনবৃত্তান্ত; ৩। প্রবোধ প্রভাকর; ৪। নিজস্ব কবিতার সঙ্কলনঃ হিত-প্রভাকর, ৫। হিতোপদেশের গল্প গদ্যপদ্যে রচিত, মহাকবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মহাশয়ের বিরচিত কবিতাবলীর সারসংগ্রহ, ৬। কবিভ্রাতা রামচন্দ্র গুপ্ত কর্তৃক সংবাদ প্রভাকর থেকে সংগৃহীত কবিতার খন্ড খন্ড সঙ্কলন, বোধেন্দুবিকাশ, ৭। নাটক; সত্যনারায়ণের ব্রতকথা। পত্রিকা সম্পাদনাঃ ১। সংবাদ প্রভাকর, ২। সংবাদ-রত্নাবলী ৩। পাষন্ড পীড়ন ও ৪।সংবাদ সাধুরঞ্জন। ১৮৫৯ সালের ২৩ জানুয়ারি মৃত্যুবরন করেন কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। যমক (একই বর্ণসমষ্টি একাধিকবার একাধিক অর্থে প্রয়োগ করা) ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের একটি প্রিয় কাব্যকৌশল। কতগুলো নমুনাঃ ১। অতনু শাসনে তনু তনু অনুদিন (১ম তনু= দেহ, ২য় তনু= কৃশ) ২। ভাবে নাহি ভাবি ভাবি (১ম ভাবি= ভাবনা করি, ২য় ভাবি= ভবিষ্যৎ) ৩। আনা দরে আনা যায় কত আনারস (১ম আনা= টাকার ১/১৬ অংশ, ২য় আনা= আনয়ন করা) ৪। প্রকাশিয়া প্রভাকর শুভ দিন দিন (১ম দিন= দিবস, ২য় দিন= প্রদান করুন) ৫। মিথ্যার কাননে কভু ভ্রমে নাহি ভ্রমে (১ম ভ্রমে= ভুলে, ২য় ভ্রমে= ভ্রমণ করে) ৬। দুহিতা আনিয়া যদি না দেহ, নিশ্চয় আমি ত্যাজিব দেহ (১ম দেহ= প্রদান কর, ২য় দেহ= শরীর) ৭। ওরে ভণ্ড হাতে দণ্ড এ কেমন রোগ। দণ্ডে দণ্ডে নিজ দণ্ডে দণ্ড কর ভোগ।। (অর্থঃ দণ্ডে দণ্ডে= সময়ে সময়ে, নিজ দণ্ডে= নিজের ডাণ্ডায়, দণ্ড= শাস্তি) ৮। কয় মাস খাও মাস উদর ভরিয়া। (অর্থঃ ১ম মাস= ৩০ দিন, ২য় মাস= মাংস) ৯। চিত্রকরে চিত্র করে করে তুলি তুলি। (অর্থঃ চিত্রকরে = চিত্রকর+ ৭মী বিভক্তি। চিত্র করে = ছবি আঁকে। করে= হাতে। ১ম তুলি = উত্তোলন করে, ২য় তুলি= আঁকার কাঠি) ১০। সেতার অনেক আছে, সে তার ত নাই। (অর্থঃ সেতার= বাদ্যযন্ত্রবিশেষ, সে তার= সেই তন্ত্র) ১১। তানপুরা আছে মাত্র, তান পুরা নাই। (অর্থঃ তানপুরা= বাদ্যযন্ত্রবিশেষ, তান পুরা= সম্পূর্ণ তান) মাতৃভাষা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মায়ের কোলেতে শুয়ে ঊরুতে মস্তক থুয়ে খল খল সহাস্য বদন। অধরে অমৃত ক্ষরে আধ আধ মৃদু স্বরে আধ আধ বচনরচন।। কহিতে অন্তরে আশা মুখে নাহি কটু ভাষা ব্যাকুল হয়েছে কত তায়। মা-ম্মা-মা-মা-বা-ব্বা-বা-বা আবো আবো আবা আবা সমুদয় দেববাণী প্রায়।। ক্রমেতে ফুটিল মুখ উঠিল মনের সুখ একে একে দেখিলে সকল। মেসো, পিসে, খুড়ো, বাপ জুজু, ভুত, ছুঁচো, সাপ স্থল জল আকাশ অনল।। ভাল মন্দ জানিতে না, মল মুত্র মানিতে না, উপদেশ শিক্ষা হল যত। পঞ্চমেতে হাতে খড়ি, খাইয়া গুরুর ছড়ি, পাঠশালে পড়িয়াছ কত।। যৌবনের আগমনে, জ্ঞানের প্রতিভা সনে, বস্তুবোধ হইল তোমার। পুস্তক করিয়া পাঠ, দেখিয়া ভবের নাট, হিতাহিত করিছ বিচার।। যে ভাষায় হয়ে প্রীত পরমেশ-গুণ-গীত বৃদ্ধকালে গান কর মুখে। মাতৃসম মাতৃভাষা পুরালে তোমার আশা তুমি তার সেবা কর সুখে।। তপসে মাছ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ কষিত-কনককান্তি কমনীয় কায়। গালভরা গোঁফ-দাড়ি তপস্বীর প্রায়॥ মানুষের দৃশ্য নও বাস কর নীরে। মোহন মণির প্রভা ননীর শরীরে॥ পাখি নও কিন্তু ধর মনোহর পাখা। সমধুর মিষ্ট রস সব-অঙ্গে মাখা॥ একবার রসনায় যে পেয়েছে তার। আর কিছু মুখে নাহি ভাল লাগে তার॥ দৃশ্য মাত্র সর্বগাত্র প্রফুল্লিত হয়। সৌরভে আমোদ করে ত্রিভুবনময়॥ প্রাণে নাহি দেরি সয় কাঁটা আঁশ বাছা। ইচ্ছা করে একেবারে গালে দিই কাঁচা॥ অপরূপ হেরে রূপ পুত্রশোক হরে। মুখে দেওয়া দূরে থাক গন্ধে পেট ভরে॥ কুড়ি দরে কিনে লই দেখে তাজা তাজা। টপাটপ খেয়ে ফেলি ছাঁকাতেলে ভাজা॥ না করে উদর যেই তোমায় গ্রহণ। বৃথায় জীবন তার বৃথায় জীবন॥ নগরের লোক সব এই কয় মাস। তোমার কৃপায় করে মহা সুখে বাস॥ কে? ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বল দেখি এ জগতে ধার্মিক কে হয়, সর্ব জীবে দয়া যার, ধার্মিক সে হয়। বল দেখি এ জগতে সুখী বলি কারে, সতত আরোগী যেই, সুখী বলি তারে। বল দেখি এ জগতে বিজ্ঞ বলি কারে, হিতাহিত বোধ যার, বিজ্ঞ বলি তারে। বল দেখি এ জগতে ধীর বলি কারে, বিপদে যে স্থির থাকে, ধীর বলি তারে। বল দেখি এ জগতে মূর্খ বলি কারে, নিজ কার্য নষ্ট করে, মূর্খ বলি তারে। বল দেখি এ জগতে সাধু বলি কারে, পরের যে ভাল করে, সাধু বলি তারে। বল দেখি এ জগতে জ্ঞানী বলি কারে, নিজ বোধ আছে যার জ্ঞানী বলি তারে। মানুষ কে? ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত নাহি চায় রাজ্যপদ নাহি চায় ধন। স্বর্গের সমান দেখে বন উপবন।। পৃথিবীর সমুদয় নিজ পরিজন। সন্তোষের সিংহাসনে বাস করে মন।। আত্মার সহিত সব সমতুল্য গণে। মাতাপিতা জ্ঞাতি ভাই ভেদ নাহি মনে।। সকলে সমান মিত্র শত্রু নাহি যার। মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর? অহংকার-মদে কভু নহে অভিমানী। সর্বদা রসনারাজ্যে বাস করে বাণী।। ভুবন ভূষিত সদা বক্তৃতার বশে। পর্বত সলিল হয় রসনার রসে।। মিথ্যার কাননে কভু ভ্রমে নাহি ভ্রমে। অঙ্গীকার অস্বীকার নাহি কোন ক্রমে।। অমৃত নিঃসৃত হয় প্রতি বাক্যে যার। মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর? চষ্টা যত্ন অনুরাগ মনের বান্ধব। আলস্য তাদের কাছে রণে পরাভব।। ভক্তিমতে কুশলগণে আয় আয় ডাকে।। পরিশ্রম প্রতিজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে থাকে। চেষ্টায় সুসিদ্ধ করে জীবনের আশা। যতনে হৃদয়েতে সমুদয় বাসা।। স্মরণ স্মরণ মাত্রে আজ্ঞাকারী যার। মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর?
কবি, সাহিত্যিক, সম্পাদক এবং সাংবাদিক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (জন্মঃ- ৬ মার্চ, ১৮১২ - মৃত্যুঃ- ২৩ জানুয়ারি, ১৮৫৯) কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত, ব্যপ্ত চরাচর, / যাহার প্রভায় প্রভা পায় প্রভাকর। বাংলাসাহিত্যে আধুনিক যুগের সূত্রপাত হয় উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে। এই যুগের প্রথম কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। যিনি "গুপ্ত কবি" নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর ছদ্মনাম 'ভ্রমণকারী বন্ধু'। এছাড়া বহুবিধ পত্র-পত্রিকা সম্পাদনা করে কবি-সাহিত্যিকদের উৎসাহ প্রদানের জন্য সমসাময়িককালে তিনি "কবিগুরু" হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছ্নে। সামাজিক ও ব্যঙ্গকবিতাগুলোর জন্য তাঁর সর্বাধিক খ্যাতি। রঙ্গরসপ্রবণতা ও লঘু চপলভঙ্গি তাঁর কবিতাগুলোকে উৎকর্ষ দান করেছে। তাঁর কবিতায় স্বদেশ, স্বভাষা ও ধর্মের প্রতি গভীর ভালবাসা ফুটে ওঠে | কবি ঈশ্বরচন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার কাঞ্চনপল্লী (বা কাঞ্চনপাড়া) গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা হরিনারায়ণ দাশগুপ্ত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ছিলেন। মায়ের নাম শ্রীমতি দেবী। তাঁর বয়স যখন দশ তখন তাঁর মা পরলোকগমন করেন। এর পর ঈশ্বরচন্দ্র ইংরাজি বিদ্যাভ্যাস এবং জীবিকান্বেষণের জন্য কলিকাতায় মামার বাড়ীতে বাস করতে শুরু করেন। মাত্র ১৫ বৎসর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় গৌরহরি মল্লিকের কন্যা রেবার সঙ্গে। ঈশ্বর গুপ্তের সারাজীবন মোটেই সুখের হয়নি। ‘ঈশ্বরগুপ্ত, সাংবাদিক কবি ও গদ্যশিল্পী’তে ড. রেণুপদ ঘোষ লিখেছেন, “তাঁর সেই ব্যর্থ দাম্পত্যজীবনের দুঃখ বা গ্লানির মত অসুস্থতা থেকে ‘সংবাদ প্রভাকর’-ই ঈশ্বর গুপ্তকে মুক্তির নাসিংহোমের নির্ভুল ঠিকানা দিতে পেরেছিল। রচনায় বৈচিত্র থাকলেও ঈশ্বর গুপ্ত কবি হিসেবেই পরিচিত। তার কবিতার সংখ্যা যেমন অগণিত, তেমনি বিষয়ের বৈচিত্রও কম নয়। বঙ্কিমচন্দ্র ঈশ্বর গুপ্তের কবিতাগুলোকে বিষয়ানুযায়ী কয়টি ভাগে বিভক্ত করেছিলেনঃ ১। পারমার্থিক ও নৈতিক বিষয়ক কবিতা, ২। সামাজিক ও ব্যঙ্গপ্রধান কবিতা, ৩। রসাত্মক কবিতা, ৪। যুদ্ধ বিষয়ক কবিতা, ৫। ঋতুবর্ণনা প্রধান কবিতা, ৬। বিবিধ বিষয়ক কবিতা, ৭। শকুন্তলার কাহিনী নিয়ে রচিত কবিতা, ৮। সারদা-মঙ্গল বা উমা-মেনকার প্রসঙ্গে কবিতা, ৯। কাব্যকানন, ১০। রসলহরী ও ১১। কবিতাগুচ্ছ। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সাহিত্যসাধনার সূত্রপাত হয় ১৮৩১ সাল থেকে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রধান লেখক। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি তিনি সংবাদ রত্নাবলী পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। সংবাদ প্রভাকর ছিল একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা, তিনি এটিকে দৈনিকে রূপান্তর করেন ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে। ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে সাপ্তাহিক পাষণ্ড পত্রিকার সঙ্গে সম্পাদক হিসাবে সংযুক্ত। পরবতী বৎসর তিনি সংবাদ সাধুরঞ্জন পত্রিকার দায়িত্বভার পালন করেন। ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর সকল উদ্যমের সঙ্গে আমৃত্যু এই সাংবাদিকতাকে আশ্রয় করে ছিলেন। তাঁর কবি স্বভাবটিও অনেকখানি এই সাংবাদিকতা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। সাংবাদিক জীবনের প্রতিক্ষেত্রে যেখানেই তিনি অবিচার, অবিবেচনা কিংবা অন্যায় পক্ষপাত লক্ষ্য করেছিলেন সেখানেই তাঁর বলিষ্ঠ প্রতিবাদ প্রভাকরের সম্পাদকীয় কলমে সোচচার করে তুলেছিল। উচচশিক্ষিতরা ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি মোহগ্রস্থ হলে ঈশ্বর গুপ্ত তার প্রতিবাদে মুখর হন। সংবাদ প্রভাকরের সম্পাদকীয়তে (১২ বৈশাখ, ১২৫৬ বঙ্গাব্দ) তিনি লেখেন –“দেশীয় লোকেরা পরদেশীয় ভাষাশিক্ষার জন্য অধিক মনোযোগি হওয়াতেই কর্তা সাহেবরা এতদ্দেশ মধ্যে ইংরাজি বিদ্যা বিস্তার নিমিত্ত অধিক যত্ন করিতেছেন। অতএব যুক্তিমতে বিবেচনা করিলে দেশীয় মহাশয়দিগের প্রতিই সকল দোষ অর্পিত হইতে পারে।” যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে ইংরাজের অনুকরণে দেশীয় ঐতিহ্যকে ঘৃণার চোখে দেখা তিনি স্বদেশের অবমাননা গণ্য করছেন, যার অর্থ তাঁর কাছে, শিকড় থেকে নিজেকে উৎপাটিত করা। তিনি যুব সম্প্রদায়ের মোহমুক্তি চেয়ে সম্পাদকীয় কলমে বারে বারে প্রতিবাদ করেছেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অত্যাচার এবং পক্ষপাতমূলক বিচারের লক্ষ্যে ইংরেজদের শাস্তির আওতায় না রাখা ঈশ্বর গুপ্ত সুনজরে দেখেননি। এমন পক্ষপাতদুষ্ট শাসনব্যবস্থাকে তিনি তীব্র কষাঘাত করেছেন। একজন যথার্থ সাংবাদিক যেভাবে রাষ্ট্রকাঠামোর সর্বস্তরে বিচরণ করে সরকারের ত্রুটি বিচু্যতির দিকে সাধারণ মানুষের নজর টানার চেষ্টা করেছ়েন, যাতে সেই অসংগতি সংশোধিত হতে পারে, ঈশ্বর গুপ্ত নির্ভীকভাবে সেটাই করেছেন। যাবতীয় ত্রুটিগুলি তিনি দেখাবার চেষ্টা করেছেন, যাতে মানুষ অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হন। এখানেই নির্ভীক সাংবাদিক-সম্পাদক ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্তের আপসহীন কলমের সার্থকতা। সামাজিক ও ব্যঙ্গকবিতাগুলোর জন্যও ঈশ্বরগুপ্তের সর্বাধিক খ্যাতি। তার রঙ্গরসপ্রবণতা ও লঘু চপলভঙ্গি কবিতাগুলোকে উৎকর্ষ দান করেছে। সে আমলে ইংরেজি শিক্ষাসভ্যতার সংস্পর্শে বাঙালির সমাজ ও জীবনে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল ঈশ্বরগুপ্ত তাকে কবিতার উপজীব্য করেছেন। যেখানেই সামাজিক অনাচার, চারিত্রিক দৈন্য ও আদর্শহীনতা দেখেছেন সেখানেই তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন। ইংরেজদের আচার আচরণকে এ দেশের জন্য অকল্যাণকর মনে করে ইংরেজিয়ানা প্রীতির ব্যঙ্গ করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তার ‘ইংরেজি নববর্ষ’ কবিতায়ঃ গোরার দঙ্গলে গিয়া কথা কহ হেসে। ঠেস মেরে বস গিয়া বিবিদের ঘেঁসে॥ রাঙ্গামুখ দেখে বাবা টেনে লও হ্যাম। ডোন্ট ক্যার হিন্দুয়ানী ড্যাম ড্যাম ড্যাম॥ পিঁড়ি পেতে ঝুরো লুসে মিছে ধরি নেম। মিসে নাহি মিস খায় কিসে হবে ফেম? শাড়িপরা এলোচুল আমাদের মেম। বেলাক নেটিভ লেডি শেম্ শেম্ শেম্ ॥ (সংক্ষেপিত) তিনি গ্রাম গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন এবং কবিগান বাঁধতেন। প্রায় বারো বৎসর গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে তিনি প্রাচীন কবিদের তথ্য সংগ্রহ করে জীবনী রচনা করেছেন। ঈশ্বর গুপ্ত অজস্র কবিতা রচনা করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথম ঈশ্বর গুপ্তের ‘কবিতা সংগ্রহ’ দীর্ঘ ভূমিকাসহ প্রকাশ করেন। তবে অশ্লীলতার কারণে সব কবিতা তিনি সংগ্রহ করেন নি। তার অন্যান্য রচনা হচ্ছেঃ ১।কালীকীর্তন, ২। রামপ্রসাদ সেন লিখিত, ঈশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত; কবিবর ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের জীবনবৃত্তান্ত; ৩। প্রবোধ প্রভাকর; ৪। নিজস্ব কবিতার সঙ্কলনঃ হিত-প্রভাকর, ৫। হিতোপদেশের গল্প গদ্যপদ্যে রচিত, মহাকবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মহাশয়ের বিরচিত কবিতাবলীর সারসংগ্রহ, ৬। কবিভ্রাতা রামচন্দ্র গুপ্ত কর্তৃক সংবাদ প্রভাকর থেকে সংগৃহীত কবিতার খন্ড খন্ড সঙ্কলন, বোধেন্দুবিকাশ, ৭। নাটক; সত্যনারায়ণের ব্রতকথা। পত্রিকা সম্পাদনাঃ ১। সংবাদ প্রভাকর, ২। সংবাদ-রত্নাবলী ৩। পাষন্ড পীড়ন ও ৪।সংবাদ সাধুরঞ্জন। ১৮৫৯ সালের ২৩ জানুয়ারি মৃত্যুবরন করেন কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। যমক (একই বর্ণসমষ্টি একাধিকবার একাধিক অর্থে প্রয়োগ করা) ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের একটি প্রিয় কাব্যকৌশল। কতগুলো নমুনাঃ ১। অতনু শাসনে তনু তনু অনুদিন (১ম তনু= দেহ, ২য় তনু= কৃশ) ২। ভাবে নাহি ভাবি ভাবি (১ম ভাবি= ভাবনা করি, ২য় ভাবি= ভবিষ্যৎ) ৩। আনা দরে আনা যায় কত আনারস (১ম আনা= টাকার ১/১৬ অংশ, ২য় আনা= আনয়ন করা) ৪। প্রকাশিয়া প্রভাকর শুভ দিন দিন (১ম দিন= দিবস, ২য় দিন= প্রদান করুন) ৫। মিথ্যার কাননে কভু ভ্রমে নাহি ভ্রমে (১ম ভ্রমে= ভুলে, ২য় ভ্রমে= ভ্রমণ করে) ৬। দুহিতা আনিয়া যদি না দেহ, নিশ্চয় আমি ত্যাজিব দেহ (১ম দেহ= প্রদান কর, ২য় দেহ= শরীর) ৭। ওরে ভণ্ড হাতে দণ্ড এ কেমন রোগ। দণ্ডে দণ্ডে নিজ দণ্ডে দণ্ড কর ভোগ।। (অর্থঃ দণ্ডে দণ্ডে= সময়ে সময়ে, নিজ দণ্ডে= নিজের ডাণ্ডায়, দণ্ড= শাস্তি) ৮। কয় মাস খাও মাস উদর ভরিয়া। (অর্থঃ ১ম মাস= ৩০ দিন, ২য় মাস= মাংস) ৯। চিত্রকরে চিত্র করে করে তুলি তুলি। (অর্থঃ চিত্রকরে = চিত্রকর+ ৭মী বিভক্তি। চিত্র করে = ছবি আঁকে। করে= হাতে। ১ম তুলি = উত্তোলন করে, ২য় তুলি= আঁকার কাঠি) ১০। সেতার অনেক আছে, সে তার ত নাই। (অর্থঃ সেতার= বাদ্যযন্ত্রবিশেষ, সে তার= সেই তন্ত্র) ১১। তানপুরা আছে মাত্র, তান পুরা নাই। (অর্থঃ তানপুরা= বাদ্যযন্ত্রবিশেষ, তান পুরা= সম্পূর্ণ তান) মাতৃভাষা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মায়ের কোলেতে শুয়ে ঊরুতে মস্তক থুয়ে খল খল সহাস্য বদন। অধরে অমৃত ক্ষরে আধ আধ মৃদু স্বরে আধ আধ বচনরচন।। কহিতে অন্তরে আশা মুখে নাহি কটু ভাষা ব্যাকুল হয়েছে কত তায়। মা-ম্মা-মা-মা-বা-ব্বা-বা-বা আবো আবো আবা আবা সমুদয় দেববাণী প্রায়।। ক্রমেতে ফুটিল মুখ উঠিল মনের সুখ একে একে দেখিলে সকল। মেসো, পিসে, খুড়ো, বাপ জুজু, ভুত, ছুঁচো, সাপ স্থল জল আকাশ অনল।। ভাল মন্দ জানিতে না, মল মুত্র মানিতে না, উপদেশ শিক্ষা হল যত। পঞ্চমেতে হাতে খড়ি, খাইয়া গুরুর ছড়ি, পাঠশালে পড়িয়াছ কত।। যৌবনের আগমনে, জ্ঞানের প্রতিভা সনে, বস্তুবোধ হইল তোমার। পুস্তক করিয়া পাঠ, দেখিয়া ভবের নাট, হিতাহিত করিছ বিচার।। যে ভাষায় হয়ে প্রীত পরমেশ-গুণ-গীত বৃদ্ধকালে গান কর মুখে। মাতৃসম মাতৃভাষা পুরালে তোমার আশা তুমি তার সেবা কর সুখে।। তপসে মাছ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ কষিত-কনককান্তি কমনীয় কায়। গালভরা গোঁফ-দাড়ি তপস্বীর প্রায়॥ মানুষের দৃশ্য নও বাস কর নীরে। মোহন মণির প্রভা ননীর শরীরে॥ পাখি নও কিন্তু ধর মনোহর পাখা। সমধুর মিষ্ট রস সব-অঙ্গে মাখা॥ একবার রসনায় যে পেয়েছে তার। আর কিছু মুখে নাহি ভাল লাগে তার॥ দৃশ্য মাত্র সর্বগাত্র প্রফুল্লিত হয়। সৌরভে আমোদ করে ত্রিভুবনময়॥ প্রাণে নাহি দেরি সয় কাঁটা আঁশ বাছা। ইচ্ছা করে একেবারে গালে দিই কাঁচা॥ অপরূপ হেরে রূপ পুত্রশোক হরে। মুখে দেওয়া দূরে থাক গন্ধে পেট ভরে॥ কুড়ি দরে কিনে লই দেখে তাজা তাজা। টপাটপ খেয়ে ফেলি ছাঁকাতেলে ভাজা॥ না করে উদর যেই তোমায় গ্রহণ। বৃথায় জীবন তার বৃথায় জীবন॥ নগরের লোক সব এই কয় মাস। তোমার কৃপায় করে মহা সুখে বাস॥ কে? ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বল দেখি এ জগতে ধার্মিক কে হয়, সর্ব জীবে দয়া যার, ধার্মিক সে হয়। বল দেখি এ জগতে সুখী বলি কারে, সতত আরোগী যেই, সুখী বলি তারে। বল দেখি এ জগতে বিজ্ঞ বলি কারে, হিতাহিত বোধ যার, বিজ্ঞ বলি তারে। বল দেখি এ জগতে ধীর বলি কারে, বিপদে যে স্থির থাকে, ধীর বলি তারে। বল দেখি এ জগতে মূর্খ বলি কারে, নিজ কার্য নষ্ট করে, মূর্খ বলি তারে। বল দেখি এ জগতে সাধু বলি কারে, পরের যে ভাল করে, সাধু বলি তারে। বল দেখি এ জগতে জ্ঞানী বলি কারে, নিজ বোধ আছে যার জ্ঞানী বলি তারে। মানুষ কে? ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কবি, সাহিত্যিক, সম্পাদক এবং সাংবাদিক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (জন্মঃ- ৬ মার্চ, ১৮১২ - মৃত্যুঃ- ২৩ জানুয়ারি, ১৮৫৯) কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত, ব্যপ্ত চরাচর, / যাহার প্রভায় প্রভা পায় প্রভাকর। বাংলাসাহিত্যে আধুনিক যুগের সূত্রপাত হয় উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে। এই যুগের প্রথম কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। যিনি "গুপ্ত কবি" নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর ছদ্মনাম 'ভ্রমণকারী বন্ধু'। এছাড়া বহুবিধ পত্র-পত্রিকা সম্পাদনা করে কবি-সাহিত্যিকদের উৎসাহ প্রদানের জন্য সমসাময়িককালে তিনি "কবিগুরু" হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছ্নে। সামাজিক ও ব্যঙ্গকবিতাগুলোর জন্য তাঁর সর্বাধিক খ্যাতি। রঙ্গরসপ্রবণতা ও লঘু চপলভঙ্গি তাঁর কবিতাগুলোকে উৎকর্ষ দান করেছে। তাঁর কবিতায় স্বদেশ, স্বভাষা ও ধর্মের প্রতি গভীর ভালবাসা ফুটে ওঠে | কবি ঈশ্বরচন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার কাঞ্চনপল্লী (বা কাঞ্চনপাড়া) গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা হরিনারায়ণ দাশগুপ্ত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ছিলেন। মায়ের নাম শ্রীমতি দেবী। তাঁর বয়স যখন দশ তখন তাঁর মা পরলোকগমন করেন। এর পর ঈশ্বরচন্দ্র ইংরাজি বিদ্যাভ্যাস এবং জীবিকান্বেষণের জন্য কলিকাতায় মামার বাড়ীতে বাস করতে শুরু করেন। মাত্র ১৫ বৎসর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় গৌরহরি মল্লিকের কন্যা রেবার সঙ্গে। ঈশ্বর গুপ্তের সারাজীবন মোটেই সুখের হয়নি। ‘ঈশ্বরগুপ্ত, সাংবাদিক কবি ও গদ্যশিল্পী’তে ড. রেণুপদ ঘোষ লিখেছেন, “তাঁর সেই ব্যর্থ দাম্পত্যজীবনের দুঃখ বা গ্লানির মত অসুস্থতা থেকে ‘সংবাদ প্রভাকর’-ই ঈশ্বর গুপ্তকে মুক্তির নাসিংহোমের নির্ভুল ঠিকানা দিতে পেরেছিল। রচনায় বৈচিত্র থাকলেও ঈশ্বর গুপ্ত কবি হিসেবেই পরিচিত। তার কবিতার সংখ্যা যেমন অগণিত, তেমনি বিষয়ের বৈচিত্রও কম নয়। বঙ্কিমচন্দ্র ঈশ্বর গুপ্তের কবিতাগুলোকে বিষয়ানুযায়ী কয়টি ভাগে বিভক্ত করেছিলেনঃ ১। পারমার্থিক ও নৈতিক বিষয়ক কবিতা, ২। সামাজিক ও ব্যঙ্গপ্রধান কবিতা, ৩। রসাত্মক কবিতা, ৪। যুদ্ধ বিষয়ক কবিতা, ৫। ঋতুবর্ণনা প্রধান কবিতা, ৬। বিবিধ বিষয়ক কবিতা, ৭। শকুন্তলার কাহিনী নিয়ে রচিত কবিতা, ৮। সারদা-মঙ্গল বা উমা-মেনকার প্রসঙ্গে কবিতা, ৯। কাব্যকানন, ১০। রসলহরী ও ১১। কবিতাগুচ্ছ। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সাহিত্যসাধনার সূত্রপাত হয় ১৮৩১ সাল থেকে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রধান লেখক। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি তিনি সংবাদ রত্নাবলী পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। সংবাদ প্রভাকর ছিল একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা, তিনি এটিকে দৈনিকে রূপান্তর করেন ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে। ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে সাপ্তাহিক পাষণ্ড পত্রিকার সঙ্গে সম্পাদক হিসাবে সংযুক্ত। পরবতী বৎসর তিনি সংবাদ সাধুরঞ্জন পত্রিকার দায়িত্বভার পালন করেন। ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর সকল উদ্যমের সঙ্গে আমৃত্যু এই সাংবাদিকতাকে আশ্রয় করে ছিলেন। তাঁর কবি স্বভাবটিও অনেকখানি এই সাংবাদিকতা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। সাংবাদিক জীবনের প্রতিক্ষেত্রে যেখানেই তিনি অবিচার, অবিবেচনা কিংবা অন্যায় পক্ষপাত লক্ষ্য করেছিলেন সেখানেই তাঁর বলিষ্ঠ প্রতিবাদ প্রভাকরের সম্পাদকীয় কলমে সোচচার করে তুলেছিল। উচচশিক্ষিতরা ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি মোহগ্রস্থ হলে ঈশ্বর গুপ্ত তার প্রতিবাদে মুখর হন। সংবাদ প্রভাকরের সম্পাদকীয়তে (১২ বৈশাখ, ১২৫৬ বঙ্গাব্দ) তিনি লেখেন –“দেশীয় লোকেরা পরদেশীয় ভাষাশিক্ষার জন্য অধিক মনোযোগি হওয়াতেই কর্তা সাহেবরা এতদ্দেশ মধ্যে ইংরাজি বিদ্যা বিস্তার নিমিত্ত অধিক যত্ন করিতেছেন। অতএব যুক্তিমতে বিবেচনা করিলে দেশীয় মহাশয়দিগের প্রতিই সকল দোষ অর্পিত হইতে পারে।” যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে ইংরাজের অনুকরণে দেশীয় ঐতিহ্যকে ঘৃণার চোখে দেখা তিনি স্বদেশের অবমাননা গণ্য করছেন, যার অর্থ তাঁর কাছে, শিকড় থেকে নিজেকে উৎপাটিত করা। তিনি যুব সম্প্রদায়ের মোহমুক্তি চেয়ে সম্পাদকীয় কলমে বারে বারে প্রতিবাদ করেছেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অত্যাচার এবং পক্ষপাতমূলক বিচারের লক্ষ্যে ইংরেজদের শাস্তির আওতায় না রাখা ঈশ্বর গুপ্ত সুনজরে দেখেননি। এমন পক্ষপাতদুষ্ট শাসনব্যবস্থাকে তিনি তীব্র কষাঘাত করেছেন। একজন যথার্থ সাংবাদিক যেভাবে রাষ্ট্রকাঠামোর সর্বস্তরে বিচরণ করে সরকারের ত্রুটি বিচু্যতির দিকে সাধারণ মানুষের নজর টানার চেষ্টা করেছ়েন, যাতে সেই অসংগতি সংশোধিত হতে পারে, ঈশ্বর গুপ্ত নির্ভীকভাবে সেটাই করেছেন। যাবতীয় ত্রুটিগুলি তিনি দেখাবার চেষ্টা করেছেন, যাতে মানুষ অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হন। এখানেই নির্ভীক সাংবাদিক-সম্পাদক ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্তের আপসহীন কলমের সার্থকতা। সামাজিক ও ব্যঙ্গকবিতাগুলোর জন্যও ঈশ্বরগুপ্তের সর্বাধিক খ্যাতি। তার রঙ্গরসপ্রবণতা ও লঘু চপলভঙ্গি কবিতাগুলোকে উৎকর্ষ দান করেছে। সে আমলে ইংরেজি শিক্ষাসভ্যতার সংস্পর্শে বাঙালির সমাজ ও জীবনে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল ঈশ্বরগুপ্ত তাকে কবিতার উপজীব্য করেছেন। যেখানেই সামাজিক অনাচার, চারিত্রিক দৈন্য ও আদর্শহীনতা দেখেছেন সেখানেই তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন। ইংরেজদের আচার আচরণকে এ দেশের জন্য অকল্যাণকর মনে করে ইংরেজিয়ানা প্রীতির ব্যঙ্গ করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তার ‘ইংরেজি নববর্ষ’ কবিতায়ঃ গোরার দঙ্গলে গিয়া কথা কহ হেসে। ঠেস মেরে বস গিয়া বিবিদের ঘেঁসে॥ রাঙ্গামুখ দেখে বাবা টেনে লও হ্যাম। ডোন্ট ক্যার হিন্দুয়ানী ড্যাম ড্যাম ড্যাম॥ পিঁড়ি পেতে ঝুরো লুসে মিছে ধরি নেম। মিসে নাহি মিস খায় কিসে হবে ফেম? শাড়িপরা এলোচুল আমাদের মেম। বেলাক নেটিভ লেডি শেম্ শেম্ শেম্ ॥ (সংক্ষেপিত) তিনি গ্রাম গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন এবং কবিগান বাঁধতেন। প্রায় বারো বৎসর গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে তিনি প্রাচীন কবিদের তথ্য সংগ্রহ করে জীবনী রচনা করেছেন। ঈশ্বর গুপ্ত অজস্র কবিতা রচনা করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথম ঈশ্বর গুপ্তের ‘কবিতা সংগ্রহ’ দীর্ঘ ভূমিকাসহ প্রকাশ করেন। তবে অশ্লীলতার কারণে সব কবিতা তিনি সংগ্রহ করেন নি। তার অন্যান্য রচনা হচ্ছেঃ ১।কালীকীর্তন, ২। রামপ্রসাদ সেন লিখিত, ঈশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত; কবিবর ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের জীবনবৃত্তান্ত; ৩। প্রবোধ প্রভাকর; ৪। নিজস্ব কবিতার সঙ্কলনঃ হিত-প্রভাকর, ৫। হিতোপদেশের গল্প গদ্যপদ্যে রচিত, মহাকবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মহাশয়ের বিরচিত কবিতাবলীর সারসংগ্রহ, ৬। কবিভ্রাতা রামচন্দ্র গুপ্ত কর্তৃক সংবাদ প্রভাকর থেকে সংগৃহীত কবিতার খন্ড খন্ড সঙ্কলন, বোধেন্দুবিকাশ, ৭। নাটক; সত্যনারায়ণের ব্রতকথা। পত্রিকা সম্পাদনাঃ ১। সংবাদ প্রভাকর, ২। সংবাদ-রত্নাবলী ৩। পাষন্ড পীড়ন ও ৪।সংবাদ সাধুরঞ্জন। ১৮৫৯ সালের ২৩ জানুয়ারি মৃত্যুবরন করেন কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। যমক (একই বর্ণসমষ্টি একাধিকবার একাধিক অর্থে প্রয়োগ করা) ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের একটি প্রিয় কাব্যকৌশল। কতগুলো নমুনাঃ ১। অতনু শাসনে তনু তনু অনুদিন (১ম তনু= দেহ, ২য় তনু= কৃশ) ২। ভাবে নাহি ভাবি ভাবি (১ম ভাবি= ভাবনা করি, ২য় ভাবি= ভবিষ্যৎ) ৩। আনা দরে আনা যায় কত আনারস (১ম আনা= টাকার ১/১৬ অংশ, ২য় আনা= আনয়ন করা) ৪। প্রকাশিয়া প্রভাকর শুভ দিন দিন (১ম দিন= দিবস, ২য় দিন= প্রদান করুন) ৫। মিথ্যার কাননে কভু ভ্রমে নাহি ভ্রমে (১ম ভ্রমে= ভুলে, ২য় ভ্রমে= ভ্রমণ করে) ৬। দুহিতা আনিয়া যদি না দেহ, নিশ্চয় আমি ত্যাজিব দেহ (১ম দেহ= প্রদান কর, ২য় দেহ= শরীর) ৭। ওরে ভণ্ড হাতে দণ্ড এ কেমন রোগ। দণ্ডে দণ্ডে নিজ দণ্ডে দণ্ড কর ভোগ।। (অর্থঃ দণ্ডে দণ্ডে= সময়ে সময়ে, নিজ দণ্ডে= নিজের ডাণ্ডায়, দণ্ড= শাস্তি) ৮। কয় মাস খাও মাস উদর ভরিয়া। (অর্থঃ ১ম মাস= ৩০ দিন, ২য় মাস= মাংস) ৯। চিত্রকরে চিত্র করে করে তুলি তুলি। (অর্থঃ চিত্রকরে = চিত্রকর+ ৭মী বিভক্তি। চিত্র করে = ছবি আঁকে। করে= হাতে। ১ম তুলি = উত্তোলন করে, ২য় তুলি= আঁকার কাঠি) ১০। সেতার অনেক আছে, সে তার ত নাই। (অর্থঃ সেতার= বাদ্যযন্ত্রবিশেষ, সে তার= সেই তন্ত্র) ১১। তানপুরা আছে মাত্র, তান পুরা নাই। (অর্থঃ তানপুরা= বাদ্যযন্ত্রবিশেষ, তান পুরা= সম্পূর্ণ তান) মাতৃভাষা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মায়ের কোলেতে শুয়ে ঊরুতে মস্তক থুয়ে খল খল সহাস্য বদন। অধরে অমৃত ক্ষরে আধ আধ মৃদু স্বরে আধ আধ বচনরচন।। কহিতে অন্তরে আশা মুখে নাহি কটু ভাষা ব্যাকুল হয়েছে কত তায়। মা-ম্মা-মা-মা-বা-ব্বা-বা-বা আবো আবো আবা আবা সমুদয় দেববাণী প্রায়।। ক্রমেতে ফুটিল মুখ উঠিল মনের সুখ একে একে দেখিলে সকল। মেসো, পিসে, খুড়ো, বাপ জুজু, ভুত, ছুঁচো, সাপ স্থল জল আকাশ অনল।। ভাল মন্দ জানিতে না, মল মুত্র মানিতে না, উপদেশ শিক্ষা হল যত। পঞ্চমেতে হাতে খড়ি, খাইয়া গুরুর ছড়ি, পাঠশালে পড়িয়াছ কত।। যৌবনের আগমনে, জ্ঞানের প্রতিভা সনে, বস্তুবোধ হইল তোমার। পুস্তক করিয়া পাঠ, দেখিয়া ভবের নাট, হিতাহিত করিছ বিচার।। যে ভাষায় হয়ে প্রীত পরমেশ-গুণ-গীত বৃদ্ধকালে গান কর মুখে। মাতৃসম মাতৃভাষা পুরালে তোমার আশা তুমি তার সেবা কর সুখে।। তপসে মাছ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ কষিত-কনককান্তি কমনীয় কায়। গালভরা গোঁফ-দাড়ি তপস্বীর প্রায়॥ মানুষের দৃশ্য নও বাস কর নীরে। মোহন মণির প্রভা ননীর শরীরে॥ পাখি নও কিন্তু ধর মনোহর পাখা। সমধুর মিষ্ট রস সব-অঙ্গে মাখা॥ একবার রসনায় যে পেয়েছে তার। আর কিছু মুখে নাহি ভাল লাগে তার॥ দৃশ্য মাত্র সর্বগাত্র প্রফুল্লিত হয়। সৌরভে আমোদ করে ত্রিভুবনময়॥ প্রাণে নাহি দেরি সয় কাঁটা আঁশ বাছা। ইচ্ছা করে একেবারে গালে দিই কাঁচা॥ অপরূপ হেরে রূপ পুত্রশোক হরে। মুখে দেওয়া দূরে থাক গন্ধে পেট ভরে॥ কুড়ি দরে কিনে লই দেখে তাজা তাজা। টপাটপ খেয়ে ফেলি ছাঁকাতেলে ভাজা॥ না করে উদর যেই তোমায় গ্রহণ। বৃথায় জীবন তার বৃথায় জীবন॥ নগরের লোক সব এই কয় মাস। তোমার কৃপায় করে মহা সুখে বাস॥ কে? ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বল দেখি এ জগতে ধার্মিক কে হয়, সর্ব জীবে দয়া যার, ধার্মিক সে হয়। বল দেখি এ জগতে সুখী বলি কারে, সতত আরোগী যেই, সুখী বলি তারে। বল দেখি এ জগতে বিজ্ঞ বলি কারে, হিতাহিত বোধ যার, বিজ্ঞ বলি তারে। বল দেখি এ জগতে ধীর বলি কারে, বিপদে যে স্থির থাকে, ধীর বলি তারে। বল দেখি এ জগতে মূর্খ বলি কারে, নিজ কার্য নষ্ট করে, মূর্খ বলি তারে। বল দেখি এ জগতে সাধু বলি কারে, পরের যে ভাল করে, সাধু বলি তারে। বল দেখি এ জগতে জ্ঞানী বলি কারে, নিজ বোধ আছে যার জ্ঞানী বলি তারে। মানুষ কে? ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত নাহি চায় রাজ্যপদ নাহি চায় ধন। স্বর্গের সমান দেখে বন উপবন।। পৃথিবীর সমুদয় নিজ পরিজন। সন্তোষের সিংহাসনে বাস করে মন।। আত্মার সহিত সব সমতুল্য গণে। মাতাপিতা জ্ঞাতি ভাই ভেদ নাহি মনে।। সকলে সমান মিত্র শত্রু নাহি যার। মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর? অহংকার-মদে কভু নহে অভিমানী। সর্বদা রসনারাজ্যে বাস করে বাণী।। ভুবন ভূষিত সদা বক্তৃতার বশে। পর্বত সলিল হয় রসনার রসে।। মিথ্যার কাননে কভু ভ্রমে নাহি ভ্রমে। অঙ্গীকার অস্বীকার নাহি কোন ক্রমে।। অমৃত নিঃসৃত হয় প্রতি বাক্যে যার। মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর? চষ্টা যত্ন অনুরাগ মনের বান্ধব। আলস্য তাদের কাছে রণে পরাভব।। ভক্তিমতে কুশলগণে আয় আয় ডাকে।। পরিশ্রম প্রতিজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে থাকে। চেষ্টায় সুসিদ্ধ করে জীবনের আশা। যতনে হৃদয়েতে সমুদয় বাসা।। স্মরণ স্মরণ মাত্রে আজ্ঞাকারী যার। মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর?
- গান প্রতিটি মানুষের ভালো লাগে তার মধ্যে কিছুটা রয়েছে রোমান্টিক গান এটি আধুনিক যুগে প্রচলিত যেমন কিছু রোমান্টিক গান আপনাদের কাছে অনেক পছন্দ হতে পারে3
- মঙ্গলবার বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। আগামী দুদিন সামান্য বাড়বে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। আগামী কয়েক দিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২২ থেকে ২৪ এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩২ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর মধ্যে থাকবে।1
- #laldlordprotestatfactory : खड़गपुर में जमीन गंवाने वाले किसानों का प्रदर्शन, नेशनल हाईवे पर लगा जाम। #kharagpurlocalarea #birlaopuspaintfactory #landlords #protest #NationalHighway #block #trafficjam #police #kharagpurnews91
- সাইকেলে বাড়ি ফেরাই হল কাল ভরতপুরে পথ দুর্ঘটনায় ঝরে গেল ১৩ বছরের সাইন সেখের প্রান1
- পশ্চিম মেদিনীপুরের নেপুরা এলাকায় প্লাস্টিকের বল ভেবে একটি বস্তু ফেলে দিতে গিয়ে বিস্ফোরণে গুরুতর জখম হন এক ব্যক্তি। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় আতঙ্ক ছড়ানোর পাশাপাশি শুরু হয়েছে শাসক ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক তরজা।1
- Post by Sk Nayum1
- মঙ্গলবার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনার শ্রীনগরে এসে ভারতীয় জনতা পার্টি ইস্তেহার প্রকাশ করে না প্রকাশ করে সংকল্প বললেন আরামবাগ বিধানসভার বিধায়ক মধুসূদন বাগ।1
- গান মনকে শুধু ভালো রাখে, অন্য চিন্তা থেকে বিরত রাখে তাই এই গানটি যদি ভালো লাগে সবার কাছে একটি লাইক করবেন শুধুমাত্র আর কিছু করতে হবে না সবাই ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন1