সবার হৃদয়ে নচিকেতা হেমন্ত বিধান সরণীর নামকরা এক হোটেল। দোকানের কাউন্টারে তখন তুমুল ব্যস্ততা। হঠাৎই বেজে উঠল ফোন। ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল এক গম্ভীরাদেশ— “শুনুন, আজ আপনাদের কাউন্টারে আর কোনো ‘ফাউল কাটলেট’ সাধারণ কাস্টমারদের জন্য বিক্রি হবে না। দোকানের সব কাটলেট এক্ষুনি প্যাক করে আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দিন।” এক-আধটা নয়, প্রায় ৬০-৭০ পিস কাটলেট! হোটেল মালিক তো অবাক! কিন্তু আদেশ অমান্য করার জো নেই। কারণ আদেশটা দিয়েছেন স্বয়ং নচিকেতা ঘোষ। বাড়িতে তখন বসেছে চাঁদের হাট, সঙ্গীত জগতের রথী-মহারথীরা উপস্থিত। তাঁদের আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখা যাবে না। পকেটের রেস্তো যা-ই থাক, মেজাজটা হতে হবে ষোলআনা জমিদারি! এই যে এক অদ্ভুত খেয়ালিপনা, এই যে আড্ডার মাঝে হঠাৎ এমন বাদশাহি ফরমান— এরই নাম নচিকেতা ঘোষ। বাংলা গানের ইতিহাসের এক এবং অদ্বিতীয় ‘আনপ্রেডিকটেবল’ জাদুকর। গতকাল ২৮ শে জানুয়ারি ছিল এই সুরস্রষ্টার জন্মদিন। ১৯২৫ সালের সেদিনটায় খোদ সরস্বতী পুজোর তিথিতেই যে তাঁর জন্ম। তিথির লগ্নই যেন বলে দিয়েছিল, এই শিশু আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যেতে আসেনি। স্বয়ং বাগদেবী হয়তো নিজের হাতেই আশীর্বাদের তিলক পরিয়ে পাঠিয়েছিলেন তাঁর এই বরপুত্রকে। ডাক্তারবংশের ছেলে, তুতো দাদা-দিদি সবাই ডাক্তার, বাড়ির কড়া শাসনে তাঁকেও এম.বি.বি.এস পাশ করতে হলো। কিন্তু স্টেথোস্কোপের যান্ত্রিক শব্দে তাঁর মন টেকেনি। রক্তে যাঁর সুরের নেশা, তিনি কি আর চেম্বারের চার দেওয়ালে বন্দি থাকতে পারেন? শ্যামবাজারের বাড়িতে রবিবার বিকেলে যখন বাবা ডাক্তার সনৎকুমার ঘোষের চেম্বারই গানের আসরে বদলে যেত, তখন থেকেই কিশোর নচিকেতার ধমনীতে সুরের খেলা শুরু। তবে এই সুরের নেশা তাঁকে কম ঝক্কি পোহাতে দেয়নি। একবার এক হাড়কাঁপানো শীতের রাতে সঙ্গীত সম্মেলনে তবলা বাজিয়ে ফিরলেন। মা উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এত রাত হলো! কার সাথে বাজালি?” উৎসাহী ছেলের উত্তর— “জদ্দন বাঈয়ের সঙ্গে!” (যিনি ছিলেন অভিনেত্রী নার্গিসের মা)। ব্যাস! গোঁড়া হিন্দু ঠাকুমার কানে কথাটা যেতেই বাড়িতে হুলুস্থুল। ওই কনকনে শীতের রাতে বারান্দায় দাঁড় করিয়ে ছেলের মাথায় বালতি বালতি ঠাণ্ডা জল ঢেলে ‘শুদ্ধিকরণ’ করা হলো, তবেই মিলল ঘরে ঢোকার অনুমতি! কিন্তু সেই জেদি ছেলে কি আর এত সহজে দমে যাওয়ার পাত্র? মানুষটা ছিলেন আগাগোড়া অনিশ্চয়তায় ভরা। কখন যে তাঁর মাথায় কোন সুর খেলবে, আর কখন যে মেজাজ কোন দিকে মোড় নেবে— তা বোধহয় তিনি নিজেও জানতেন না। ছেলে সুপর্ণকান্তিকে যদি জিজ্ঞেস করেন, তিনিও এককথায় বাবাকে এই বিশেষণই দেবেন— ‘আনপ্রেডিকটেবল’। হয়তো মাকে বায়না ধরলেন ফুলকপি দিয়ে ভেটকি মাছ রাঁধতে। মা যত্ন করে রাঁধলেন। কিন্তু রাত ন’টা বাজতেই সুরকারের মুড সুইং! বলে বসলেন, “চলো, আজ সদলবলে চাইনিজ খাব।” সাধের ভেটকি রইল পড়ে, তিনি চললেন পার্ক স্ট্রিট। সেখানকার ওয়েটার ফিলিপকে আবার ধমক— “ফিলিপ, আমাকে শুধু ‘পিস’ (মটরশুঁটি) দিও, ‘ব্যাম্বু’ (বাঁশ) অন্য কাউকে দিও!” ছেলেরাও বাবার এই অদ্ভুত মেজাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বড় হয়েছে। বাবা নামিদামি ব্র্যান্ডের সিগারেট খেতেন, আবার দু-এক টান দিয়েই ফেলে দিতেন। ছেলে সুপর্ণকান্তি সেই আধা-খাওয়া দামি সিগারেটগুলো কুড়িয়ে লুকিয়ে রাখতেন বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করবেন বলে— বাবার ফেলে দেওয়া জিনিসেও যে এক ধরণের আভিজাত্য ছিল! তাঁর এই জমিদারি মেজাজ কিন্তু নতুন নয়। শোনা যায়, দুর্ভিক্ষের সময়ও নাকি ঠাকুমা তাঁর প্রিয় নাতির জন্য বাজার থেকে গলদা চিংড়ি আনিয়ে রাখতেন। ছোটবেলায় মামাবাড়ি গেলে দাদুর মতো তাঁর মাথাতেও নাকি পরিচারক রুপোর ছাতা ধরত! সেই অভ্যাস বড়বয়েসেও যায়নি। বাজার করার জন্য কোনোদিন তাঁকে ব্যাগ হাতে দেখা যায়নি, ওটা তাঁর ধাতে সইত না। সুর নিয়ে তাঁর পাগলামির গল্পগুলো তো রূপকথার মতো। একবার স্টার থিয়েটারে রবিশঙ্করের সেতার শুনতে গিয়েছেন। রাত তখন তিনটে, রবিবাবু সবে বিলম্বিত থেকে দ্রুত লয়ে ঢুকছেন। ঠিক সেই সময় নচিকেতা ঘোষ কানে আঙুল দিয়ে দে ছুট! সোজা বাড়ি। কারণ? অন্য সুর কানে ঢুকলে যদি নিজের মাথায় চলতে থাকা সুরটা গুলিয়ে যায়! এসেই বাড়ির সবাইকে জাগিয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে পড়লেন। বাস তখনো চালু হয়নি, তবু গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে ফোন করে তলব— “তাড়াতাড়ি আয়, নইলে গানটা অন্য কাউকে দিয়ে দেব।” তৈরি হলো কালজয়ী গান— ‘বনে নয় মনে মোর পাখি আজ গান গায়’। পকেটে সব সময় থাকত একটা ছোট খাতা, আদর করে নাম দিয়েছিলেন ‘ধোপার খাতা’। রাস্তাঘাটে, আড্ডায়— যেখানেই নতুন কোনো সুর বা মুখড়া পেতেন, টুকে রাখতেন সেই খাতায়। তাঁর রসবোধও ছিল মারাত্মক। একবার বন্ধু দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গজল গাইতে উঠেছেন। আগেই দ্বিজেনকে সাবধান করলেন, “তুই কিন্তু একদম হাসবি না।” স্টেজে উঠে একই লাইন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাইতে লাগলেন, মাঝেমধ্যে নিজের মতো অদ্ভুত লাইন জুড়ে দিচ্ছেন। দর্শক হেসে কুটিপাটি, আবার হাততালিও দিচ্ছে! এই ছিলেন নচিকেতা ঘোষ। ছেলেমেয়েদের প্রতিও তাঁর শাসন ছিল অদ্ভুত। গান নিয়ে মত্ত থাকতেন, ছেলেমেয়েরা কোন ক্লাসে পড়ে ভুলে যেতেন। অথচ সেই বাবাই একদিন ছেলেকে ডেকে বায়োলজি পড়াচ্ছেন। খাতায় নিখুঁত হাতে ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিলেন কানের গঠনতন্ত্র। ডাক্তারি পড়েছিলেন বলেই হয়তো শরীরের বিজ্ঞান আর সুরের বিজ্ঞান—দুটোই তাঁর নখদর্পণে ছিল। আবার সেই বাবাই ছেলেকে সিনেমা হলের ৬৫ পয়সার টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বকুনি দিয়েছিলেন— “এর পর থেকে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভালো টিকিট কেটে সিনেমা দেখবে, খবরদার ওই লাইনে দাঁড়াবে না!” গানের লিরিকে নতুনত্ব আনতে তিনি ছিলেন আপসহীন। পার্ক স্ট্রিটের বারে বসে সাহিত্যিক সমরেশ বসুর সঙ্গে চলত তাঁর ‘শব্দচর্চা’। সেখান থেকেই বাংলা গান পেল ‘লুটেরা ছুরি’, ‘খুনেরা ছুরি’-র মতো সব বৈপ্লবিক শব্দবন্ধ। আবার ‘চিরদিনের’ ছবিতে তবলা বাজানোর জন্য বারাণসী থেকে উড়িয়ে এনেছিলেন পণ্ডিত শান্তাপ্রসাদকে। এডিটিংয়ে বাজনার সঙ্গে আঙুল মিলছে না দেখে, রাধাকান্ত নন্দীর হাতে মেকআপ করিয়ে আবার শ্যুট করিয়ে তবেই শান্তি পেয়েছিলেন। আর সাউন্ড এফেক্ট? সে এক ইতিহাস। ‘ধন্যি মেয়ে’ ছবিতে ‘যা যা বেহায়া পাখি’ গানে পাখির ডাক দরকার। লিরিকে নেই, তো কী হয়েছে? তিনি হরবোলা মন্টু বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে সেই ডাক সৃষ্টি করালেন। ‘ফরিয়াদ’ ছবির গানে আশা ভোঁসলের সেই বিখ্যাত হাসি রেকর্ড করার জন্য তিনি আশাজিকে বলেছিলেন, “তুমি সুচিত্রা সেনের মতো হাসতে পারবে না।” ব্যাস, জেদের বশে আশাজি এমন এক হাসি হাসলেন, যা আজও আইকনিক। আর সবথেকে মজার ঘটনা ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র রেকর্ডিংয়ে। রাক্ষুসি হাড় চিবোবে, কিন্তু সেই ‘কুড়মুড়’ শব্দটা ঠিকঠাক আসছিল না। উপায়? স্টুডিওতে আনিয়ে নিলেন বস্তাভর্তি লেড়ো বিস্কুট! হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তিদের হাতে ধরিয়ে দিলেন সেই বিস্কুট। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা সবাই বিস্কুট চিবোলেন, আর সেই আওয়াজ দিয়েই তৈরি হলো রাক্ষুসি’র হাড় চিবোনোর শব্দ! মাঝখানে কিছুদিন অভিমানে মুম্বাই পাড়ি দিয়েছিলেন। সঞ্জীব কুমারের সঙ্গে অফিস ভাগ করে নিয়েছেন, বাঙালি রান্না করে খাইয়েছেন, কিন্তু বলিউডের জাঁকজমক এই খাঁটি বাঙালি সুরকারকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “বম্বেও কিছু পেল না, বাংলাদেশও কিছু পেল না।” সবাই ভেবেছিল নচিকেতা বুঝি ফুরিয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি ফিরলেন রাজার মতো। ১৯৬৯ সালে ‘শেষ থেকে শুরু’ দিয়ে। কিশোর কুমার গাইলেন ‘বল হরি হরি বল’— আর বুঝিয়ে দিলেন, আসল শিল্পী কখনো ফুরোয় না। মাত্র ৫১ বছরের জীবন। কিন্তু শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন সুরের পূজারী। সেদিনও ছেলেমেয়েদের নিয়ে জুহু বিচে গিয়েছেন, বল কিনে দিয়েছেন। ফেরার পথে স্টিয়ারিং ধরা অবস্থাতেই বুঝলেন শরীরটা সঙ্গ দিচ্ছে না। ডাক্তার ছিলেন তো, তাই নিজেই বুঝেছিলেন হার্ট অ্যাটাক। নিজেই গাড়ি চালিয়ে পৌঁছলেন ডাক্তারের কাছে, নিজেই বাতলে দিলেন ওষুধ। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনটা ছকে বাঁধা কোনো সমীকরণ নয়, বরং এক অপরিকল্পিত সুরের খেলা। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে গেলেও, বাঙালির মনে তিনি চিরস্থায়ী। আজও যখন রেডিওতে বেজে ওঠে তাঁর সুর, মনে হয় তিনি কোথাও যাননি। হয়তো ওই লেড়ো বিস্কুটের কুড়মুড়ানি, কিংবা হারমোনিয়ামের রিডে— তিনি আজও আমাদের আশেপাশেই আছেন, মিটিমিটি হাসছেন আর নতুন কোনো সুর ভাঁজছেন তাঁর সেই ‘ধোপার খাতা’য়।
সবার হৃদয়ে নচিকেতা হেমন্ত বিধান সরণীর নামকরা এক হোটেল। দোকানের কাউন্টারে তখন তুমুল ব্যস্ততা। হঠাৎই বেজে উঠল ফোন। ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল এক গম্ভীরাদেশ— “শুনুন, আজ আপনাদের কাউন্টারে আর কোনো ‘ফাউল কাটলেট’ সাধারণ কাস্টমারদের জন্য বিক্রি হবে না। দোকানের সব কাটলেট এক্ষুনি প্যাক করে আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দিন।” এক-আধটা নয়, প্রায় ৬০-৭০ পিস কাটলেট! হোটেল মালিক তো অবাক! কিন্তু আদেশ অমান্য করার জো নেই। কারণ আদেশটা দিয়েছেন স্বয়ং নচিকেতা ঘোষ। বাড়িতে তখন বসেছে চাঁদের হাট, সঙ্গীত জগতের রথী-মহারথীরা উপস্থিত। তাঁদের আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখা যাবে না। পকেটের রেস্তো যা-ই থাক, মেজাজটা হতে হবে ষোলআনা জমিদারি! এই যে এক অদ্ভুত খেয়ালিপনা, এই যে আড্ডার মাঝে হঠাৎ এমন বাদশাহি ফরমান— এরই নাম নচিকেতা ঘোষ। বাংলা গানের ইতিহাসের এক এবং অদ্বিতীয় ‘আনপ্রেডিকটেবল’ জাদুকর। গতকাল ২৮ শে জানুয়ারি ছিল এই সুরস্রষ্টার জন্মদিন। ১৯২৫ সালের সেদিনটায় খোদ সরস্বতী পুজোর তিথিতেই যে তাঁর জন্ম। তিথির লগ্নই যেন বলে দিয়েছিল, এই শিশু আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যেতে আসেনি। স্বয়ং বাগদেবী হয়তো নিজের হাতেই আশীর্বাদের তিলক পরিয়ে পাঠিয়েছিলেন তাঁর এই বরপুত্রকে। ডাক্তারবংশের ছেলে, তুতো দাদা-দিদি সবাই ডাক্তার, বাড়ির কড়া শাসনে তাঁকেও এম.বি.বি.এস পাশ করতে হলো। কিন্তু স্টেথোস্কোপের যান্ত্রিক শব্দে তাঁর মন টেকেনি। রক্তে যাঁর সুরের নেশা, তিনি কি আর চেম্বারের চার দেওয়ালে বন্দি থাকতে পারেন? শ্যামবাজারের বাড়িতে রবিবার বিকেলে যখন বাবা ডাক্তার সনৎকুমার ঘোষের চেম্বারই গানের আসরে বদলে যেত, তখন থেকেই কিশোর নচিকেতার ধমনীতে সুরের খেলা শুরু। তবে এই সুরের নেশা তাঁকে কম ঝক্কি পোহাতে দেয়নি। একবার এক হাড়কাঁপানো শীতের রাতে সঙ্গীত সম্মেলনে তবলা বাজিয়ে ফিরলেন। মা উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এত রাত হলো! কার সাথে বাজালি?” উৎসাহী ছেলের উত্তর— “জদ্দন বাঈয়ের সঙ্গে!” (যিনি ছিলেন অভিনেত্রী নার্গিসের মা)। ব্যাস! গোঁড়া হিন্দু ঠাকুমার কানে কথাটা যেতেই বাড়িতে হুলুস্থুল। ওই কনকনে শীতের রাতে বারান্দায় দাঁড় করিয়ে ছেলের মাথায় বালতি বালতি ঠাণ্ডা জল ঢেলে ‘শুদ্ধিকরণ’ করা হলো, তবেই মিলল ঘরে ঢোকার অনুমতি! কিন্তু সেই জেদি ছেলে কি আর এত সহজে দমে যাওয়ার পাত্র? মানুষটা ছিলেন আগাগোড়া অনিশ্চয়তায় ভরা। কখন যে তাঁর মাথায় কোন সুর খেলবে, আর কখন যে মেজাজ কোন দিকে মোড় নেবে— তা বোধহয় তিনি নিজেও জানতেন না। ছেলে সুপর্ণকান্তিকে যদি জিজ্ঞেস করেন, তিনিও এককথায় বাবাকে এই বিশেষণই দেবেন— ‘আনপ্রেডিকটেবল’। হয়তো মাকে বায়না ধরলেন ফুলকপি দিয়ে ভেটকি মাছ রাঁধতে। মা যত্ন করে রাঁধলেন। কিন্তু রাত ন’টা বাজতেই সুরকারের মুড সুইং! বলে বসলেন, “চলো, আজ সদলবলে চাইনিজ খাব।” সাধের ভেটকি রইল পড়ে, তিনি চললেন পার্ক স্ট্রিট। সেখানকার ওয়েটার ফিলিপকে আবার ধমক— “ফিলিপ, আমাকে শুধু ‘পিস’ (মটরশুঁটি) দিও, ‘ব্যাম্বু’ (বাঁশ) অন্য কাউকে দিও!” ছেলেরাও বাবার এই অদ্ভুত মেজাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বড় হয়েছে। বাবা নামিদামি ব্র্যান্ডের সিগারেট খেতেন, আবার দু-এক টান দিয়েই ফেলে দিতেন। ছেলে সুপর্ণকান্তি সেই আধা-খাওয়া দামি সিগারেটগুলো কুড়িয়ে লুকিয়ে রাখতেন বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করবেন বলে— বাবার ফেলে দেওয়া জিনিসেও যে এক ধরণের আভিজাত্য ছিল! তাঁর এই জমিদারি মেজাজ কিন্তু নতুন নয়। শোনা যায়, দুর্ভিক্ষের সময়ও নাকি ঠাকুমা তাঁর প্রিয় নাতির জন্য বাজার থেকে গলদা চিংড়ি আনিয়ে রাখতেন। ছোটবেলায় মামাবাড়ি গেলে দাদুর মতো তাঁর মাথাতেও নাকি পরিচারক রুপোর ছাতা ধরত! সেই অভ্যাস বড়বয়েসেও যায়নি। বাজার করার জন্য কোনোদিন তাঁকে ব্যাগ হাতে দেখা যায়নি, ওটা তাঁর ধাতে সইত না। সুর নিয়ে তাঁর পাগলামির গল্পগুলো তো রূপকথার মতো। একবার স্টার থিয়েটারে রবিশঙ্করের সেতার শুনতে গিয়েছেন। রাত তখন তিনটে, রবিবাবু সবে বিলম্বিত থেকে দ্রুত লয়ে ঢুকছেন। ঠিক সেই সময় নচিকেতা ঘোষ কানে আঙুল দিয়ে দে ছুট! সোজা বাড়ি। কারণ? অন্য সুর কানে ঢুকলে যদি নিজের মাথায় চলতে থাকা সুরটা গুলিয়ে যায়! এসেই বাড়ির সবাইকে জাগিয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে পড়লেন। বাস তখনো চালু হয়নি, তবু গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে ফোন করে তলব— “তাড়াতাড়ি আয়, নইলে গানটা অন্য কাউকে দিয়ে দেব।” তৈরি হলো কালজয়ী গান— ‘বনে নয় মনে মোর পাখি আজ গান গায়’। পকেটে সব সময় থাকত একটা ছোট খাতা, আদর করে নাম দিয়েছিলেন ‘ধোপার খাতা’। রাস্তাঘাটে, আড্ডায়— যেখানেই নতুন কোনো সুর বা মুখড়া পেতেন, টুকে রাখতেন সেই খাতায়। তাঁর রসবোধও ছিল মারাত্মক। একবার বন্ধু দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গজল গাইতে উঠেছেন। আগেই দ্বিজেনকে সাবধান করলেন, “তুই কিন্তু একদম হাসবি না।” স্টেজে উঠে একই লাইন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাইতে লাগলেন, মাঝেমধ্যে নিজের মতো অদ্ভুত লাইন জুড়ে দিচ্ছেন। দর্শক হেসে কুটিপাটি, আবার হাততালিও দিচ্ছে! এই ছিলেন নচিকেতা ঘোষ। ছেলেমেয়েদের প্রতিও তাঁর শাসন ছিল অদ্ভুত। গান নিয়ে মত্ত থাকতেন, ছেলেমেয়েরা কোন ক্লাসে পড়ে ভুলে যেতেন। অথচ সেই বাবাই একদিন ছেলেকে ডেকে বায়োলজি পড়াচ্ছেন। খাতায় নিখুঁত হাতে ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিলেন কানের গঠনতন্ত্র। ডাক্তারি পড়েছিলেন বলেই হয়তো শরীরের বিজ্ঞান আর সুরের বিজ্ঞান—দুটোই তাঁর নখদর্পণে ছিল। আবার সেই বাবাই ছেলেকে সিনেমা হলের ৬৫ পয়সার টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বকুনি দিয়েছিলেন— “এর পর থেকে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভালো টিকিট কেটে সিনেমা দেখবে, খবরদার ওই লাইনে দাঁড়াবে না!” গানের লিরিকে নতুনত্ব আনতে তিনি ছিলেন আপসহীন। পার্ক স্ট্রিটের বারে বসে সাহিত্যিক সমরেশ বসুর সঙ্গে চলত তাঁর ‘শব্দচর্চা’। সেখান থেকেই বাংলা গান পেল ‘লুটেরা ছুরি’, ‘খুনেরা ছুরি’-র মতো সব বৈপ্লবিক শব্দবন্ধ। আবার ‘চিরদিনের’ ছবিতে তবলা বাজানোর জন্য বারাণসী থেকে উড়িয়ে এনেছিলেন পণ্ডিত শান্তাপ্রসাদকে। এডিটিংয়ে বাজনার সঙ্গে আঙুল মিলছে না দেখে, রাধাকান্ত নন্দীর হাতে মেকআপ করিয়ে আবার শ্যুট করিয়ে তবেই শান্তি পেয়েছিলেন। আর সাউন্ড এফেক্ট? সে এক ইতিহাস। ‘ধন্যি মেয়ে’ ছবিতে ‘যা যা বেহায়া পাখি’ গানে পাখির ডাক দরকার। লিরিকে নেই, তো কী হয়েছে? তিনি হরবোলা মন্টু বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে সেই ডাক সৃষ্টি করালেন। ‘ফরিয়াদ’ ছবির গানে আশা ভোঁসলের সেই বিখ্যাত হাসি রেকর্ড করার জন্য তিনি আশাজিকে বলেছিলেন, “তুমি সুচিত্রা সেনের মতো হাসতে পারবে না।” ব্যাস, জেদের বশে আশাজি এমন এক হাসি হাসলেন, যা আজও আইকনিক। আর সবথেকে মজার ঘটনা ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র রেকর্ডিংয়ে। রাক্ষুসি হাড় চিবোবে, কিন্তু সেই ‘কুড়মুড়’ শব্দটা ঠিকঠাক আসছিল না। উপায়? স্টুডিওতে আনিয়ে নিলেন বস্তাভর্তি লেড়ো বিস্কুট! হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তিদের হাতে ধরিয়ে দিলেন সেই বিস্কুট। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা সবাই বিস্কুট চিবোলেন, আর সেই আওয়াজ দিয়েই তৈরি হলো রাক্ষুসি’র হাড় চিবোনোর শব্দ! মাঝখানে কিছুদিন অভিমানে মুম্বাই পাড়ি দিয়েছিলেন। সঞ্জীব কুমারের সঙ্গে অফিস ভাগ করে নিয়েছেন, বাঙালি রান্না করে খাইয়েছেন, কিন্তু বলিউডের জাঁকজমক এই খাঁটি বাঙালি সুরকারকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “বম্বেও কিছু পেল না, বাংলাদেশও কিছু পেল না।” সবাই ভেবেছিল নচিকেতা বুঝি ফুরিয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি ফিরলেন রাজার মতো। ১৯৬৯ সালে ‘শেষ থেকে শুরু’ দিয়ে। কিশোর কুমার গাইলেন ‘বল হরি হরি বল’— আর বুঝিয়ে দিলেন, আসল শিল্পী কখনো ফুরোয় না। মাত্র ৫১ বছরের জীবন। কিন্তু শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন সুরের পূজারী। সেদিনও ছেলেমেয়েদের নিয়ে জুহু বিচে গিয়েছেন, বল কিনে দিয়েছেন। ফেরার পথে স্টিয়ারিং ধরা অবস্থাতেই বুঝলেন শরীরটা সঙ্গ দিচ্ছে না। ডাক্তার ছিলেন তো, তাই নিজেই বুঝেছিলেন হার্ট অ্যাটাক। নিজেই গাড়ি চালিয়ে পৌঁছলেন ডাক্তারের কাছে, নিজেই বাতলে দিলেন ওষুধ। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনটা ছকে বাঁধা কোনো সমীকরণ নয়, বরং এক অপরিকল্পিত সুরের খেলা। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে গেলেও, বাঙালির মনে তিনি চিরস্থায়ী। আজও যখন রেডিওতে বেজে ওঠে তাঁর সুর, মনে হয় তিনি কোথাও যাননি। হয়তো ওই লেড়ো বিস্কুটের কুড়মুড়ানি, কিংবা হারমোনিয়ামের রিডে— তিনি আজও আমাদের আশেপাশেই আছেন, মিটিমিটি হাসছেন আর নতুন কোনো সুর ভাঁজছেন তাঁর সেই ‘ধোপার খাতা’য়।
- পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কোলাঘাট এই সেতুটি ১২৫ বছরের পদার্পণ করলো, এরই পাশাপাশি এই সেতুর নতুন করে কাজের সূচনা তৈরি হবে বলে বহু মানুষের আশা,1
- নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামে প্রতিদিনই ওঠানামা। সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের বাজেট ঠিক রাখতে বাজারদরের দিকে নজর রাখা এখন অত্যন্ত জরুরি। দেখে নিন আজ বুধবার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা সংলগ্ন এলাকায় বাজারে আলু, পেঁয়াজ, শাকসবজি, মাছ ও মাংসের আনুমানিক খুচরো দাম— সবজি বাজার আলু: ₹১৫–১৮ টাকা প্রতি কেজি পেঁয়াজ: ₹২০–২৫ টাকা প্রতি কেজি টমেটো: ₹২০–২৫ টাকা প্রতি কেজি বেগুন: ₹৩০–৫০ টাকা প্রতি কেজি ফুলকপি: ₹১০–২০ টাকা প্রতি পিস বাঁধাকপি: ₹১০–২০ টাকা প্রতি পিস শাকসবজি পালংশাক: ₹১০–১৫ টাকা প্রতি আঁটি পুঁইশাক: ₹১০–১৫ টাকা প্রতি আঁটি লালশাক: ₹১০–১৫ টাকা প্রতি আঁটি শাক মিশ্র: ₹১৫–২০ টাকা প্রতি আঁটি মাছের বাজার রুই: ₹৩০০–৩৫০ টাকা প্রতি কেজি কাতলা: ₹২৫০–৩০০ টাকা প্রতি কেজি তেলাপিয়া: ₹২০০–২২০ টাকা প্রতি কেজি পাবদা: ₹৫৫০–৬৫০ টাকা প্রতি কেজি চিংড়ি (ছোট): ₹৪৫০–৫৫০ টাকা প্রতি কেজি মাংসের বাজার মুরগি (ব্রয়লার): ₹১৮০–২০০ টাকা প্রতি কেজি দেশি মুরগি: ₹৪০০–৪৫০ টাকা প্রতি কেজি খাসি মাংস: ₹৮০০–৮৫০ টাকা প্রতি কেজি বিশেষ দ্রষ্টব্য: এলাকা ও বাজারভেদে দামে কিছুটা তারতম্য হতে পারে।1
- সরকারি উন্নয়নের দাবির আড়ালে শালবনী ব্লকের লোধা জনজাতি অধ্যুষিত গ্রামে ধরা পড়ছে অন্য ছবি। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে আবাস যোজনা—একাধিক প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত গ্রামবাসীরা।1
- হাড়োয়ার সোনাপুকুর শঙ্করপুর অঞ্চল থেকে গু*/*লি ভর্তি বন্দুক সহ এক কুখ্যাত দুষ্কৃতী গ্রেফতার"" বাকিদের খোঁজে তল্লাশি পুলিসের1
- ঘাটালের নিমতলায় ট্রাফিক পুলিশের স্পেশাল চেকিং1
- শালবনীর একটি পত্যন্ত গ্রাম বুড়িশোল। উন্নয়নের ছিটে ফোঁটা নেই এই গ্রামে। এলাকার মানুষ পাননি কোনো প্রকল্পের সুবিধা। পাননি লক্ষীর ভান্ডার, পাননি বাড়ি। আজ মঙ্গলবার বেলা প্রায় ৩ তে নাগাদ এলাকায় গিয়ে দেখা গেলো গ্রামের দুর্দশার ছবি। ক্ষোভ দেখালেন স্থানীয়রা। দাবি পূরণ না হলে ভোট দেবেন না বলে জানালেন গ্রামবাসিরা।1
- ঘাটাল–পাঁশকুড়া রাজ্য সড়কে দাসপুরে ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনা1
- আজ বুধবার,আজকেও ১৬ ডিগ্রির ঘরেই সর্বনিম্ন। দিন ও রাতের তাপমাত্রা ফের স্বাভাবিকের নিচে। রাতে ও সকালে হালকা শীতের অনুভূতি। দিনে শীতের আমেজ ক্রমশ কমছে। আগামী সপ্তাহে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৮/১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে।1